ছিলেন ‘রাতের ভোটের প্রার্থী’ আর বিপ্লব বড়ুয়ার ঘনিষ্ট সাতকানিয়ার সেই দয়াল বড়ুয়া এবার ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে!

দয়াল কুমার বড়ুয়া। ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন ঢাকা-১১ আসনে। একই আসন থেকে বেশ কয়েকবার ‘চুপিচুপি’ আওয়ামী লীগের টিকিটও কেটেছিলেন। কিন্তু কপালে জোটেনি। তবে আওয়ামী লীগ আর শেখ হাসিনা বন্দনায় ‘চানকপাল’ দয়াল বাগিয়ে নিয়েছিলেন বৌদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্ট্রের ট্রাস্টি পদ। দীর্ঘ বছর আওয়ামী ‘গীত’ গাওয়া সেই দয়াল এবার নতুন মঞ্চে! সুর তুলেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষে।
আলোচিত-সমালোচিত এই দয়াল কুমার বড়ুয়ার বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশায়। একই উপজেলায় বেড়ে উঠেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়াও। তার সঙ্গে ছিল দয়ালের দহরম-মহরম।
শনিবার (২৮ জুন) ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী আন্দোলনের মহাসমাবেশের মঞ্চে ‘পুলকিত’ মেজাজে দেখা গেছে দয়াল কুমার বড়ুয়াকে। তিনি হাতপাখার বাতাসে তার ‘আওয়ামী হাওয়া’ পাল্টাতে চাইছেন নাকি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দয়ালকে ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ প্রতীক বানিয়ে মঞ্চে তুলেছেন তা স্পষ্ট হওয়া যায়নি এখনো। তবে দয়ালের বক্তব্যে আমন্ত্রণের বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট। একইসঙ্গে তার কৃতজ্ঞতার বার্তাও জানান দেয় ‘হাওয়া’ বদলের।
অত্যন্ত উচ্ছসিত কণ্ঠে দয়াল বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তন চায়, এই পরিবর্তনের রাজনীতি যিনি স্বপ্নে ধারণ করেন লালন করেন। যিনি রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি আর কেউ নন তিনি আমাদেরই ভাই, আমাদেরই গার্ডিয়ান আমাদের করিম ভাই (সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম, পীর সাহেব চরমোনাই) । ইসলামী আন্দোলনের এই মহাসমাবেশ, এখান থেকে নিশ্চয়ই একটি মেসেজ পাই। আজকের মহাসমাবেশ কেন? সংস্কার, বিচার, পিআর তিনটা বিষয়টাকে সামনে রেখে।’
ইসলামী দলগুলোর সাম্প্রতিক জোট গঠনের তৎপরতা আর তাতে এনসিপির যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে মঞ্চে উঠেই দয়াল বললেন ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’! তাহলে কি তিনি বুঝে গেছেন, আগামীর সূর্য কোন দিক থেকে উঠবে?
নাকি তিনি বলতে চাইলেন, আজকের মঞ্চেই আগামীকাল ক্ষমতার ছায়া পাওয়া যাবে? এমন প্রশ্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরছে।
মহাসমাবেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাদের মতোই দয়াল বড়ুয়াও প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) ভোটব্যবস্থার পক্ষে জোরালো সুরে কথা বলেছেন। দলটির প্রতি নিজের ‘কমিটমেন্ট’ জানিয়েছেন। মহাসমাবেশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু দাবি তোলেননি, সংখ্যালঘু ভোটের হিসাব কষে দেখিয়েছেন, কত সিট পাওয়া যায়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কল্যাণ পার্টির মনোনয়নে ঢাকা-১১ আসনের মনোনয়নপত্র জমা করছেন দয়াল বড়ুয়া।
দয়ালের ভাষ্যে, ‘বাংলাদেশে ৪২ লাখ বৌদ্ধ বাস করেন। যদি আমরা ওয়ান থার্ড ভোটার হই—তিন চৌদ্ধ বিয়াল্লিশ। দুই লক্ষ ভোটে যদি একটা সিট পাওয়া যায়, তাহলে আমরা সাতটা সিট পাই। এ পর্যন্ত আমাদেরকে শুধু ইউজ করা হয়েছে। কিন্তু আজকে, আমাদেরকে যিনি এই স্টেজে নিয়ে এসেছেন, তার প্রতি কমিটমেন্ট করতে চাই—PR-এর বিকল্প নাই।’
এদিকে এমন ‘পল্টিখেলায়’ চটেছেন ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগাররা। তাদেরই একজন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সালাহউদ্দিন সাকিব। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশে দয়ালের বক্তব্য শুনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাকিব লিখেছেন, ‘গতকাল চরমোনাইর পীরের সমাবেশে সংখ্যালঘু প্রতিনিধি হিসেবে বক্তৃতা করা দয়াল কান্তি বড়ুয়া কথিত ফ্যাসিস্টের দোসর ছিলেন। তিনি একাধিকবার ঢাকা-১৮ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ শাসনামলে দীর্ঘ ৬ বছর বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিল। সুবিধাবাদী মৌসুমি পাখি বিভিন্ন সময় জাতীয় পার্টি কল্যাণ পার্টি বর্তমান সময়ের কিংস পার্টির পরিচয় বহন করেন। তিনি গতকাল সোহরাও্য়ার্দী উদ্যানে জামাত হেফাজত এনসিপির সাথে সুর মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে বিষেদগার করেন। এই বাটপারকে চিনে রাখুন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমসা গ্রামে বাড়ী।’
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন সমালোচনার পর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মন্তব্য জানতে দলটির কেন্দ্রীয় কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফকে একাধিকবার ফোন দিয়েও কথা বলা সম্ভব হয়নি।



