এনবিআরে ‘শাটডাউন’ বন্দরে অচলাবস্থা : কনটেইনার জট, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

দ্বিতীয় দিনের মতো চলমান এনবিআর কর্মকর্তাদের ‘শাটডাউন কর্মসূচি’র কারণে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস, ভ্যাট ও কর বিভাগে সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চরম অচলাবস্থার মুখে পড়েছে। দ্রুত এ সমস্যা নিরসন না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে জানান ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরা।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭ হাজার বিল অব এন্ট্রি ও বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল হয়। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার আমদানির। বাকিগুলো রপ্তানির। এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ ঘোষিত কর্মবিরতির কারণে কোনো কার্যক্রম চলছে না। কাস্টম হাউসের কলাপসিবল গেট বন্ধ। গেটে ঝুলছে তালা। একটি চালানের কপিও ক্লিয়ার হয়নি। দেওয়া হয়নি শিপমেন্টের জন্য অনুমোদন। পাশাপাশি শুল্কায়ন না হওয়ায় জমে আছে আমদানিকারকদের ফাইল। অন্যদিকে কাস্টমস কর্মকর্তারা কাজ না করায় আগের অনুমোদন থাকলেও বন্দরের গেটে থাকা স্ক্যানিং মেশিনে পণ্য স্ক্যানিং না হওয়ায় পণ্য বন্দর থেকে বেরও হতে পারছে না। এতে অস্বস্তিতে আছেন আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, শাটডাউনের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৩ হাজার ৬৮০ একক কনটেইনার রপ্তানি হয়নি। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কনটেইনার পোশাক শিল্পের। এছাড়া আমদানিযোগ্য কনটেইনার খালাস না হওয়ায় সেগুলো বন্দরে পড়ে আছে। পাশাপাশি জাহাজিকরণ না হওয়ায় বহিনোঙরে বাড়তি খরচ গুনে আটকে আছে অনেক জাহাজ।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র ও সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘বন্দর কর্তৃপক্ষ সব বিভাগ খোলা রাখলেও কাস্টমস কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন না করায় আমদানি ও রপ্তানি উভয় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। গেটে কাস্টমস কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির কারণে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে।’
এ অচলাবস্থায় দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির প্রথম সহ-সভাপতি ও কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান। তিনি সিভয়েস২৪’কে বলেন, ‘কাস্টম ও এনবিআরের সমস্যা তো আমাদের সঙ্গে না। তাদের সমস্যাটি মূলত সরকারের সঙ্গে। কিন্তু আমাদের যেটি অবাক লাগে— আমরা কখনো এ প্রেক্ষাপটটা দেখিনি। আমি ইসরায়েল ও গাজার সঙ্গে তুলনা করে বলি— এটি এক ধরনের জেনোসাইড (গণহত্যা), জেনোসাইড অব বিজনেস কমিউনিটি অব বাংলাদেশ।’
‘এটি নিয়ে আমাদের বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট সরকারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছে মঙ্গলবার মিটিং হবে। অথচ এটি খুব জরুরি। এটি নিয়ে এই মুহূর্তে কথা বলা দরকার। কারণ যখন সমস্যা হবে, ফ্যাক্টরি বেতন দিতে পারবে না- তখন আপনারাই আমাদের ধরবেন। আগে আমাদের লিড টাইম থাকতো ১২০ দিন। এখন ৩০ দিনে দিতে হয়। স্ট্রিচিংয়ের জন্য পাই সাত (৭) দিন। এখানে তিনদিন যেহেতু নষ্ট হয়েছে, আমাকে অতিরিক্ত ওভারটাইম করাতে হবে। তাই এ অচলাবস্থার কারণে বাণিজ্যের সবদিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’-যোগ করেন সেলিম রহমান।
একই সুরে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব মো. রুহুল আমিন সিকদারও বললেন, ‘কর্মবিরতির কারণে ২১টি অফডকে রপ্তানি পণ্য আটকে আছে। কোনো চালানের শুল্কায়ন না হওয়ায় রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ এবং রাজস্ব আদায় মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমদানি পণ্যের শুল্কায়ন, খালাস ও রপ্তানি পণ্যের জাহাজে ওঠানোর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। এমনকি পূর্বে শুল্কায়িত পণ্যের খালাসেও জটিলতা দেখা দিয়েছে।’
বাপ্পু দাশ নামে একজন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বলেন, ‘আমাদের একটি রপ্তানি চালান শুক্রবার ইসহাক ডিপোতে এসেছে। কিন্তু শুল্কায়ন করা সম্ভব হয়নি, ফলে পণ্য আটকে আছে।’
চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কখনো রাজস্ব আহরণকারী কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকতে দেখিনি। কিন্তু এখন সেটি দেখছি। তাও অর্থবছরের শেষ সময়ে। সমস্যাটি যেহেতু সরকারের সঙ্গে সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার। তাই সরকার এটি দ্রুত সমাধান করুক, এটা প্রত্যাশা করি। এরপরও আমাদের এ নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। কারণ আমরা চাই না, এ দ্বন্দ্বে দেশের সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। এখানে যেসব ক্ষতি আমদানি ও রপ্তানিকারকের দেখছি। তা শেষকালে সাধারণ ভোক্তা পর্যায়েই পড়বে।’
এ নিয়ে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘বিশ্বকে আমরা কী বার্তা দিচ্ছি— একটা দেশে পুরো কাস্টমস এভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে? আমার জানা মতে, পৃথিবীর কোনো দেশে এ রকম উদাহরণ নেই, একমাত্র যুদ্ধ পরিস্থিতি ছাড়া। সুতরাং এটা হতে পারে না।’
‘এটা একটা বড় বিপর্যয় আমাদের জন্য। দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি হুমকির সম্মুখীন। আমি নিজেও দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আমদানিকৃত পণ্য সময় মত ডেলিভারি নিতে না পারার কারণে দ্বিগুণ চার গুণ হারে প্রতিদিন যে ডেমারেজ গুনতে হবে।’-বলেন মহিউদ্দিন।


