আগ্রাবাদ কলোনি স্কুল : প্রধান শিক্ষকের ‘ভুয়া’ সনদ, ‘মিথ্যা’ অভিজ্ঞতা
শিক্ষা বোর্ডের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। শিক্ষকতায় তার দীর্ঘ ২৩ বছরের অভিজ্ঞতা। কিন্তু অভিযোগ ওঠেছে, তিনি ‘ভুয়া’ শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ‘মিথ্যা’ অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহার করে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি স্কুলের টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অনিয়ম শিক্ষা বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছেন তারই সহকর্মী ওই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. গোলাম ফরহাদ।
অভিযোগের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে। গত ২ জুলাই বিদ্যালয় পরিদর্শক প্রফেসর মো. আবুল কাসেমের স্বাক্ষরিত নোটিশে কমিটি গঠন এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সীতাকুণ্ড উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এস. মোস্তফা আলম সরকারকে। এছাড়া সদস্য করা হয় পাহাড়তলীর ওয়ার্লেস ঝাউতলা কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নিজাম উদ্দিন এবং হালিশহর গরীবে নেওয়াজ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে।
শিক্ষা বোর্ডে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘসময় শিক্ষকতা করার জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছাড়াই জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি নিয়ে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম। তিনি ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। যোগদানের সময় তিনি ২০০৬ সালে ইউজিসি কর্তৃক বন্ধ ঘোষিত ‘আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি’ থেকে এমএ (ইংরেজি) পাশের সনদ ব্যবহার করেন। এছাড়া, এমপিওভুক্তির জন্য ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন হলেও জাল অভিজ্ঞতা সনদ প্রদর্শন করে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন!
এর আগে, তিনি সীতাকুণ্ডে ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ মাস এবং পাহাড়তলী বালিকা বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর চাকরি করেছেন। একই সময়ে চান্দগাঁও থানার মোহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে পাহাড়তলী বালিকা বিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় তিনি বিদ্যালয়ের সম্পত্তি ব্যবহার করে অবৈধ মার্কেট নির্মাণের মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী কাউন্সিলরকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বানিয়ে বিদ্যালয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষকদের হয়রানি, চাকরি থেকে বরখাস্তের হুমকি এবং আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, ‘মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. গোলাম ফরহাদ সিভয়েস২৪’কে বলেন, ‘বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। আমি চাই প্রতিষ্ঠানটি সঠিকভাবে পরিচালিত হোক। প্রধান শিক্ষক যদি নৈতিক বিচ্যুতি করে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কর্মজীবন ও আর্থিক অনিয়মসহ সব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি গত ২৯ বছর ধরে এখানে শিক্ষকতা করছি এবং বর্তমানে সবচেয়ে পুরাতন শিক্ষক। কোনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে নয়, বরং প্রতিষ্ঠান রক্ষার দায়বদ্ধতা থেকেই আমি অভিযোগ করেছি। এখন ন্যায়সংগত তদন্ত ও বিচারই আমার প্রত্যাশা।’
এদিকে অভিযোগ নিয়ে আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এসএমএস পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।



